বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে কাঠের ঘানিতে ভাঙা সরিষার তেলের সম্পর্ক বহু পুরোনো। একসময় প্রায় প্রতিটি গ্রামে ঘানি ছিল, যেখানে কাঠের চাপ ও ধীর গতিতে সরিষা বীজ থেকে তেল নিষ্কাশন করা হতো। আধুনিক যান্ত্রিক পদ্ধতিতে তেল উৎপাদনের যুগেও এই প্রাচীন পদ্ধতির তেল আজও জনপ্রিয়—এর বিশুদ্ধতা, পুষ্টিগুণ ও ঔষধি গুণাবলির কারণে।
১. প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে উৎপাদন
কাঠের ঘানিতে তেল ভাঙার সময় কোনো প্রকার রাসায়নিক বা তাপ প্রয়োগ করা হয় না। ঘানির ধীর গতির ঘূর্ণনের ফলে তেল ঠান্ডা অবস্থায় বের হয়, তাই এর পুষ্টি উপাদানগুলো অক্ষুণ্ণ থাকে। অন্যদিকে, মেশিনে বা রিফাইন করে উৎপাদিত তেলে উচ্চ তাপ প্রয়োগ করা হয়, যা তেলের ভিটামিন ও খনিজ উপাদান নষ্ট করে দেয়।
২. ভিটামিন ও মিনারেলে সমৃদ্ধ
ঘানি ভাঙা সরিষার তেলে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন E, যা ত্বকের সৌন্দর্য ও কোষের সুরক্ষায় সহায়তা করে। এছাড়া এতে আছে ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা হৃদরোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। তেলের মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষে ফ্রি-রেডিক্যালের ক্ষতি কমিয়ে বার্ধক্য রোধ করে।
৩. হৃদপিণ্ডের জন্য উপকারী
এই তেলে থাকা মনোআনস্যাচুরেটেড ও পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট শরীরে “খারাপ কোলেস্টেরল” (LDL) কমিয়ে “ভাল কোলেস্টেরল” (HDL) বাড়ায়। ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক বা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পরিমাণমতো সরিষার তেল ব্যবহার করলে রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা বজায় থাকে।
৪. ত্বক ও চুলের যত্নে
প্রাচীনকাল থেকেই সরিষার তেল ত্বক ও চুলের যত্নে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি ত্বককে ময়েশ্চারাইজ করে, শুষ্কতা কমায় এবং প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা আনে। চুলে ম্যাসাজ করলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, চুলের গোড়া মজবুত হয় এবং খুশকি কমে। শিশুদের শরীরে এই তেল মালিশ করলে ঘুম ভালো হয় ও হাড় শক্ত হয়।
৫. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
ঘানি ভাঙা সরিষার তেলে রয়েছে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল গুণ। এটি শরীরের ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংসে সাহায্য করে এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ করে। নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে এই তেল অন্তর্ভুক্ত করলে সর্দি, কাশি বা হালকা ঠান্ডার সমস্যা অনেকটা কমে।
৬. হজমে সহায়ক
সরিষার তেল হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে এবং পিত্ত নিঃসরণে সাহায্য করে। এতে থাকা ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস হজমতন্ত্রকে সচল রাখে, ফলে গ্যাস, বদহজম ও পেট ফাঁপার মতো সমস্যা কম হয়।